কে এই মোজতবা খামেনি? পর্দার আড়াল থেকে সর্বোচ্চ নেতা

কে এই মোজতবা খামেনি?

কে এই মোজতবা খামেনি? পর্দার আড়াল থেকে সর্বোচ্চ নেতা

ইরানের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। দেশটির অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস (Assembly of Experts) গত রোববার (৮ মার্চ) আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে (Mojtaba Khamenei) নতুন সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) হিসেবে নির্বাচিত করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নিল তেহরান।

তার বর্তমান পদ হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

জন্ম : ১৯৬৯ (মাশহাদ, ইরান)

প্রধান সমর্থক : বিপ্লবী গার্ডস (IRGC)

আন্তর্জাতিক অবস্থা: যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন

বাবার ছায়ায় থাকা মোজতবাকে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পরবর্তী নেতা ধরে নিয়েছিলেন। তাকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে বলে ভাষ্য খামেনি অনুসারীদের। মোজতবা বেশিরভাগ সময় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকেছেন, সরকারি কোনো দায়িত্বেও ছিলেন না; তার বক্তৃতার সংখ্যাও বিরল, গণমাধ্যমে তাকে দেখা গেছে হাতেগোনা কয়েকবার। কিন্তু ইরানের জটিল ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোতে তার প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত।

পরিবার ও বিয়ে

মোজতবা খামেনি বিবাহ করেছেন জাহরা হাদ্দাদ-আদেলকে। তিনি ইরানের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ Gholam‑Ali Haddad‑Adel-এর কন্যা। ২০০৪ সালে তাদের বিয়ে হয় এবং তাদের তিন সন্তান। চলতি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় জাহরা নিহত হন বলে জানা গেছে। তাদের তিনটি সন্তান রয়েছে, যদিও সন্তানদের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি।

১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেয়া মোজতবা ৬ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার ছোটবেলাতেই তার বাবা ইরানের সর্বশেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাতের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পর তাদের পরিবারের ভাগ্য বদলে যায়, রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে খামেনি পরিবার।

শিক্ষা

তেহরানে চলে আসা মোজতবা পড়তে যান আলাভি হাই স্কুলে; এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট অনেকে উঠে এসেছেন। আলাভি থেকে মোজতবা পরে যান কোমে, রক্ষণশীলদের আলেমদের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে। দশকেরও বেশি সময় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় কাটালেও তিনি আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা অর্জন করতে পারেননি।

২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোজতবাকে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আয়াতুল্লাহ খামেনি তার দায়িত্বের কিছুটা ছেলের কাছে হস্তান্তর করেছেন অভিযোগ করে ওয়াশিংটন সেসময় বলেছিল, জবাবদিহিতার বাইরে থেকে মোজতবা সরকারি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লুমবার্গ বলছে, পশ্চিমা একাধিক দেশে বেনামে মোজতাবার বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। যদিও তার সম্পদের পরিমাণ ঠিক কত, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি তারা।

মোজতবা কোন উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা নন। তিনি কখনও কোনো পদে অধিষ্ঠিত হননি এবং শাসনব্যবস্থায় তার কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা নেই। তবে, পর্দার আড়ালে তিনি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেন বলে মনে করা হয়। ইরান ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মোজতাবার ‘ক্ষমতায় আরোহণের পেছনে মূল প্রভাব’ রেখেছে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শিয়া নীতির কারণে মোজতবার নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে, তবে ইরানের অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বকেও জাতির উপর আক্রমণে নিরপেক্ষ করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছে। বাহিনীটি তাকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি খামেনির প্রতি তাদের ‘আন্তরিক ও আজীবন আনুগত্য’ ঘোষণা করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে, ‘তারা সব আদেশ মেনে চলবে এবং তা বাস্তবায়নে সদা প্রস্তুত থাকবে।’

এছাড়া দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাঘচিও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নিয়োগ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ইসরাইলের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরাইলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অনাগ্রহ দেখালেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন।

তবে তিনি মোজতবার নিয়োগে খুশি নন বলে মার্কিন কর্মকর্তরা জানিয়েছে।

এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা তার (ট্রাম্পের) ‘অনুমোদন’ ছাড়া বেশি দিন টিকতে পারবেন না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘তাকে ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনে অবশ্যই আমাদের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। তা না হলে তিনি (নতুন নেতা) বেশি দিন টিকতে পারবেন না।’

মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানের রাজনীতি কোন দিকে যাবে—এটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বড় প্রশ্ন। তিনি দীর্ঘদিন পর্দার আড়ালে থেকেও প্রভাব বিস্তার করেছেন। কিন্তু এখন তাকে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে হবে এমন এক রাষ্ট্রকে, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *