আজকের বাণিজ্য সংবাদ দেখে নিন
সরকার এক লাখ ৩০ হাজার টন সার কেনার সিদ্ধান্ত, ব্যয় ৭২২ কোটি টাকা
বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের কৃষি খাতে সার সরবরাহ বাড়াতে সরকার এক লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন সার কিনবে। এই সার কেনার জন্য মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৭২২ কোটি ১৭ লাখ ৩৩ হাজার ৭২০ টাকা। এই সারে রয়েছে দুই ধরনের সার: ৭০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার এবং ৬০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে, যেখানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
সার কেনার বিস্তারিত পরিকল্পনা
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুসারে, কানাডিয়ান কমার্শিয়াল কর্পোরেশন (সিসিসি) এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর মধ্যে চুক্তি হয়েছে কানাডা থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার আমদানির। এর জন্য ব্যয় হবে ১৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যেখানে প্রতি মেট্রিক টন সারের দাম ধরা হয়েছে ৩৫৬.২৫ মার্কিন ডলার।
তবে কেবল কানাডাই নয়, মরক্কো থেকেও ৩০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস কোম্পানির সাথে বিএডিসির চুক্তির আওতায় এ সার আনা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৮ কোটি ৮১ লাখ ৫৬ হাজার ২৪০ টাকা, যেখানে প্রতি মেট্রিক টনের দাম ৫৬৮.৬৭ মার্কিন ডলার।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সৌদি আরবের সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদন পেয়েছে সরকার। এ জন্য খরচ হবে ১৫৫ কোটি ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮০ টাকা। প্রতি মেট্রিক টন সারের দাম ধরা হয়েছে ৪২২.৬৬ মার্কিন ডলার।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ব্যাগড গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার কেনার অনুমোদন পেয়েছে সরকার। কাফকো থেকে এই সার কিনতে ব্যয় হবে ১৪৩ কোটি ৪৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, যেখানে প্রতি মেট্রিক টনের দাম ৩৯০.৭৫ মার্কিন ডলার।
সার কেনার গুরুত্ব
সরকারি এই উদ্যোগ দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সার ছাড়া ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের কৃষি প্রধান দেশ হওয়ায় সার সরবরাহ অব্যাহত রাখা খুবই জরুরি। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে সার আমদানি বা উৎপাদনে অসুবিধার কারণে দেশে সার সরবরাহ সংকটে পড়ে। সেই সমস্যা এড়াতে সরকার আগে থেকেই বড় অঙ্কের সার কিনে রাখছে।
পণ্যের মান ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
সার কেনার পাশাপাশি দেশে পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণ একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশের বাজারে হাজার হাজার পণ্য থাকলেও বাধ্যতামূলক মানসনদের আওতায় মাত্র ৩১৫টি পণ্য আছে। মান নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি থাকায় অনেক নিম্নমানের পণ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, যা ভোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা পণ্যের মান নির্ধারণ করে এবং সেই মানের ভিত্তিতে সার্টিফিকেট দেয়। তবে তারা বলছে, দেশে অনেক পণ্যের বৈশিষ্ট্যের কারণে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে সমস্যা হয়। বিশেষ করে দেশীয় পণ্য যেমন ঝালমুড়ির মতো কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান পাওয়া যায় না। এজন্য মান প্রণয়নে সময় বেশি লাগে এবং মান সঠিকভাবে নির্ধারণে বাধা আসে।
মানসনদের আওতায় পণ্যের সংখ্যা ও তাদের বাস্তবতা
বর্তমানে বাংলাদেশে ৩১৫টি পণ্য বাধ্যতামূলক মানসনদের আওতায় আনা হয়েছে, যার মধ্যে খাদ্যপণ্য ১১৫টি, ক্যেমিক্যাল পণ্য ৭৫টি, যন্ত্রপাতি ৪৪টি, পাট ও বস্ত্র পণ্য ৩১টি এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্য ৫০টি। যদিও বিএসটিআই ইতিমধ্যেই সাড়ে চার হাজারের বেশি পণ্যের মান তৈরি করেছে, কিন্তু অধিকাংশই স্বেচ্ছাসেবী মান সনদ।
মান প্রণয়নের সীমাবদ্ধতা ও করণীয়
বিএসটিআই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে মান নির্ধারণের চেষ্টা করলেও, দেশের প্রেক্ষাপটের কারণে সব মান আইএসও বা কোডেক্সের সাথে মেলে না। এই কারণে অনেক সময় মান প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা হয়। বিএসটিআইয়ের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অনেক দেশে না থাকা পণ্য যেমন ঝালমুড়ির মান তৈরি করা কঠিন।
নজরদারির দুর্বলতা ও ভোক্তাদের অভিমত
ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলেছে, মান প্রণয়ন করা হলেও সেগুলোর যথাযথ কার্যকরী নজরদারি না থাকায় বাজারে নকল ও নিম্নমানের পণ্য ছড়িয়ে পড়ছে। ক্যাবের সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুধু মান তৈরি করলেই হবে না, তা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তাও নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে বিএসটিআই দাবি করে, তারা নিয়মিত বাজার ও কারখানায় তদারকি করে থাকে এবং মান অমান্যকারী বা নকলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি দেয়।
খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ফুড সেফটি প্যারামিটার চালু
বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে বিএসটিআই ‘ফুড সেফটি প্যারামিটার’ চালু করতে যাচ্ছে। এতে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মান নির্ধারণ করা হবে। যেমন তাপমাত্রা, পিএইচ, আর্দ্রতা, রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ (কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, তেলের গুণমান), এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য (রঙ, গঠন, গন্ধ) পরীক্ষার মান নির্ধারণ করা হবে।

