গুগল পে কি? কীভাবে কাজ করে? কবে নাগাদ দেশ আসবে – Google pay
ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি সর্বক্ষেত্রে সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ঠিক সেভাবেই তথ্য প্রযুক্তিতেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের দেশে এখানও আমরা খুচরা টাকা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ি। আটানব্বই টাকার জিনিষ কিনলে দুইটাকা কম নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয় ক্রেতাদের বা চকলেট একটা হাতে ধরিয়ে দেয় বিক্রেতারা, আর নাহয় আরো তিন টাকা কম দিয়ে বাড়ি ফিরে ক্রেতারা। সময় যত দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে তার সাথে সাথে খুচরা টাকা নেওয়ার দিন তত দ্রুতই পিছনে পড়ে যাচ্ছে। কয়েন বা কাগজের নোটের পরিবর্তে একটি স্মার্ট ফোন আর সেখানের একটা এপসের মাধ্যমে সব কিছুর সমাধান হয়ে যাবে এখন।
গোটা দুনিয়ায় প্রযুক্তি চালিত লেনদেনের যেমন টাকা পাঠানো, শপিং বা বিভিন্ন পেমেন্ট করা যায় এমন মাধ্যম রয়েছে বহু, আর এর ব্যবহারকারীদের দিক থেকে বা উন্নত টেকনোলজী বা সিকিউরিটির দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় যেই মাধ্যম সেটির নাম সেটি হচ্ছে Google Pay গুগল পে । আর এই সহজ মাধ্যমটিই পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এবং এটার সুবিধা ভোগ করতে পারবে বাংলাদেশের নাগরিকরা। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু হতে যাচ্ছে গুগল পে সার্ভিস। গুগল পে’তে কি কি সুযোগ সুবিধা পাবে এর গ্রাহকরা বা নিরাপত্তা বা সুরক্ষা কেমন হবে তা অনেকেরই জানার আগ্রহ।
গুগল পে এর মালিক কে? বা এটা কি?
গুগল পে এর মালিক সরাসরি গুগল এবং এটা তাদের তৈরি একটি অনলাইন লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল ওয়ালেট। গুগল পের মাধ্যমে গ্রাহকরা খুব দ্রুত এবং সহজ পদ্ধতিতে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবে। এই সেবাটি (NFC) নেয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজ করে। এটার মাধ্যমে আপনি অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা পাবেন এবং যেখানে পেমেন্ট সুবিধা রয়েছে সেখানে যে কোন ধরনের পেমেন্ট খুব সহজেই করতে পারবেন। ধরেন, অনলাইনে শপিং করলেন সেখানো গুগল পে তে পেমেন্ট করলেন বা সরাসরি শপিং মল অথবা বাহিরের যে কোন দোকানে পেমেন্ট করতে পারবেন, ব্যবসায়ীক কাজে বা বন্ধু আত্মীয় স্বজনদেরও টাকা পাঠাতে পারবেন গুগল পে থেকে, তাছাড়াও সরকারি বিভিন্ন ফি, পেমেন্ট ও বিদ্যুৎ বিল দিতে পারবেন। এটি গ্রাহকের ব্যাংক একাউন্টের সাথে লিংক করা থাকে।
গুগল পে কিভাবে কাজ করে?
এই সুবিধা আপনি পেতে হলে সর্বপ্রথম আপনার একটি স্মার্টফোন লাগবে এবং সেখানে গুগল পে এপসটি ইনস্টল করতে হবে। তার পর আপনি সহজেই কিছু ধাপ অনুসরন করে একাউন্ট তৈরি করতে হবে। * সর্বপ্রথম অ্যাপটি ওপেন করে আপনার জিমেইল দিয়ে লগইন করতে হবে। * এরপর আপনার ব্যাংক একাউন্টের সব তথ্য সংযুক্ত করতে হবে, যেমন ক্রেডিট, ডেবিট কার্ড এর তথ্য। * তারপর আপনার হ্যান্ডসেটটির যদি বায়োমেট্রিক সুবিধা থাকে তাহলে সেটি এড করুন বা পিন দিয়ে একাউন্টটি সুরক্ষিত করুন। এখন কাজ শেষ এবার আপনি ফোন নাম্বার দিয়ে বা কিউআর কোড স্ক্যান করেও লেনদেন করতে পারবেন। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিং গুলো যেমন বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদি এমএফএস গুলোর সাথে গুগল পে সংযুক্ত থাকে কিনা, তাহলে এটা ব্যবহার আরো সহজ হবে।
গ্রাহকরা কি কি সুবিধা পেতে পারে?
- লেনদেন নিখুত ও ঝামেলাহীন – ব্যাংকে না গিয়েই আপনি ব্যাংকের সব সুযোগ সুবিধা ঘরে বসেই পেতে পারেন। তাতে আপনার সময় এবং অর্থ কোনটাই নষ্ট হবে না। আর ভাংতি টাকা বা নোট গোনার ঝামেলাও পোহাতে হবে না।
- তাড়াতাড়ি লেনেদ সম্পন্ন – সাথে সাথেই অর্থাৎ রিয়েল টাইমেই কয়েক সেকেন্ডের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন হবে।
- বিভিন্ন বিল পেমেন্ট – সহজ মাধ্যম এবং খুব দ্রুত ইন্টারনেট বিল, গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল এবং মোবাইলে টাকা রিচার্জ করতে পারবেন।
- ছোট বড় ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা- সব ধরনের ব্যবসায়ীদের জন্য গুগল পে অত্যান্ত কার্যকর হবে। তারা খুব সহজেই কিআর কোড স্ক্যান করে ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের দাম নিতে পারবে। এতে হিসাবে গড়মিল ও ভুল হওয়ারও সম্ভাবনা থাকবে না।
- টাকা হারিয়ে ফেলার ভয়- অনেক সময় ভুলবসত আমরা ব্যাগ কেথাও ফেলে আসি বা পকেট থেকে ছিনতাই হয়ে যায় তাই গুগল পে চালু হলে টাকা ছিনতাই হয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না।
- ক্যাশব্যাক ও রিওয়ার্ড – গুগল পে নিয়তি ব্যবহার করার ফলে বিভিন্ন অফার দিয়ে থাকে এবং ক্যাশব্যাক ও রিওয়ার্ড সুবিধা দিয়ে থাকে কোম্পানি। সেগুলো দিয়ে পরে বিভিন্ন কেনাকাটা করা যায়।
গুগল পে কেমন সুরক্ষিত? এটার সিকিউরিটি সিস্টেম কেমন?
আমরা সবাই কমবেশি জানি গুগল একটি বিশ্বিখ্যাত টেক জায়ান্ট পৃথীবির অর্ধেকেরও বেশি ইন্টারনেট যাদের নিয়ন্ত্রনে। তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন হবে সেটা তো একটু হলেও বুঝতে পারছেন। তাও বলি গুগল পে অত্যাধিক জনপ্রিয়তার এটাও একটি কারন এটার সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং এটার অন্যতম শক্তিও এর সিকিউরিট সেইফটির জন্য। এটার সকল তথ্য থাকে এনক্রিপ্টেড। এটাতে রয়েছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফেস লক বা বায়োমেট্রিক সিস্টেম এবং সাথে সাথে তা পিন দিয়েও সুরক্ষিত থাকে। কোন ভাবেই কেউ যেন এটার সুরক্ষার স্তর ভেদ করতে না পারে তার জন্য গুগলের ফ্রড মনিটরিং ব্যবস্থা সবসময় একটিভ থাকে।
আর বাংলাদেশে যদি এটি চালু হয় তাহলে অবশ্যই এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল রুলস এবং রেগুলেশন মেনেই চালু হবে। ফলে এটি বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত এবং নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে থাকবে।
কারা সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগ করবে?
যারা ফ্রিল্যান্সার এবং যারা বিভিন্ন আর্ন্তর্জাতিক মার্কেট প্লেসে বাংলাদেশে বসে কাজ করে তাদের জন্য এটি সবেচেয় উপকৃত একটি পেমেন্ট সিস্টেম হবে। কারন তারা গুগল পে এর মাধ্যমে খুব সহজেই বিদেশ থেকে টাকা দেশে নিয়ে আসতে পারবে। আর প্রবাসি যারা আছেন তারা রেমিটেন্স পাঠানোর ক্ষেত্রে আগের থেকে দ্রুত এবং সচ্চতার সাথে দেশে অর্থ পাঠাতে পারবে ।
বাংলাদেশে অনলাইনে অনেক ছোট বড় ব্যবসায়ী আছে যারা ক্যাশ এর চাইতেও অনলাইনে বেশি লেনদেন করে থাকেন তাদের জন্যও গুগলের এই সার্ভিস অনেক বেশি কাজে আসবে। ঘরে বসে অনেক মানুষ এখন কেনাকাটা করে তাদের জন্যও সুবিধার বার্তা বয়ে আনছে গুগল পে। গুগল পে কি?
কবে চালু হবে গুগল পে?
যুব ও ক্রীড়া, স্থানীয় সরকার ,পল্লীউন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ জানিয়েছে বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয় এই সেবা আগামী এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু হবে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে তার ভেরিফাইড পেইজে একটি পেস্টে বলেন, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই সেবা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশে চালু হতে যাচ্ছে।
বিশ্বে আরো কিছু দেশে জনপ্রিয় কিছু এরকম কিছু ডিজিটাল সেবা চালু রয়েছে, যেমন চীনে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির আলি পে রয়েছে, সেটি তাদের দেশে খুবই জনপ্রিয়। তাছাড়া কিছু দেশে স্যামসাংয়ের স্যামসাং ওয়ালেটও চলে আসছে।
বিশ্বের সবার আগে ফোন ভিত্তিক পেমেন্ট সিস্টেম চালু করে জাপান। তাদের সেবার নাম ছিল ওসাইফু কেটাই। এটার বাড়তি একটি সুবিধা ছিল মেট্রো টিকেট এবং আইডি কার্ড হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যেত।
অনেক সময় অনেক প্রযুক্তি সবার জন্য শুধুমাত্র সুবিধা বয়ে আনে না, সাথে সাথে কিছু বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। তাই আমাদের অবশ্যই কিছু সতর্কতা মেনে চলতে হবে, যেমন আমাদের গুগল ওয়ালেট থাকলেও বাড়তি সতর্কতায় সাথে সবসময় কার্ড এবং কিছু ক্যাশ রাখা জরুরী কারন যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে হঠাৎ সেবাটি নাও পেতে পারি, বা মোবাইল হারিয়ে গেলে আমরা বিপদের সম্মুখ্যিনও হতে পারি। আর এপসটির নিরাপত্তার দিকে অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে অপরিচিত থার্ড পার্টি কোন লিংকে যাও যাবে না এবং এপস সবসময় লগআউট করে রাখা উচিত ইত্যাদি।
লেখা: ইয়াসিন আরাফাত, জিও টাইমস।



