মানুষ খেকো জমিদার বাড়ি ২য় পর্ব
লেখা : ইয়াসিন আরাফাত – ২য় পর্ব (১ম পর্ব লিংক: (www.thegeotimes.com/মানুষখেকো-জমিদার-বাড়ি/)
আমরা আগেই জানতাম রাহাতের বাবা মা এতে রাজি হবে না তাই মিথ্যা বলেই বেরিয়ে পড়লাম- রাত তখন সাড়ে নয়টা কি দশটা, আর গ্রামে নয়টা দশটা মানে অনেক রাত, তাও রাত আরো গভির হওয়ার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আরো কিছুক্ষন পর রহস্যজনক বাড়ীটাতে ঢুকবো এবং এই সময়টা আমরা আমাদের ছক কষে ফেলবো কোন দিক দিয়ে ঢুকবো এবং কোন কোন জায়গা আমরা পর্যবেক্ষন করবো।
যে ভাবা সে কাজ , আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম এবং আমরা এখন সম্পুর্নরূপে প্রস্তুত সেই মানুষখেকো এবং আগুন বাড়ি জমিদার বাড়িতে ঢুকার জন্য।
আমাদের পদ্ধতি অনুযায়ী বাড়িতে ঢুকার পর আমরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যাবো যেনো যে কোন বিপদে একে অপরকে সাহায্য করতে পারি, সেই অনুযায়ী আমরা ৪ জন ঢুকে পড়লাম জমিদার বাড়ি। সরু পথ ধরে এগোতে থাকলাম রাত তখন ১২ টা বেজে ২০ মিনিট চারদিকে হুহু বাতাশ এবং অন্ধকারে ছেয়ে গেছে, আমাদের চারজনের একজনের চেহারা অন্যজন দেখছেনা এতো কালো ঘন অন্ধকার।
আমি যত সামনে এগুচ্ছি তত মনোবোল বাড়ানোর চেষ্টা করছি, নয়ন একটু পর পর বলছে, আজকে না হয় না যাই, অনেক বাতাস বইছে বৃষ্টি আসবে মনে হয়, আমি বুঝতেছি নয়ন ভয় পাচ্ছে, রাহাত আর আরমান মোটামুটিরকম স্বাভাবিকই আছে, নয়নকে কথা বলতে না করে সাবধানে হাটতে বলি, আগেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল বাড়ীর আধা মাইলের মধ্যে আমরা কোন আলো জ্বালাবোনা এমনকি ফোনের আলোওনা। তাই আমরা অন্ধকারেই কোন সাড়া শব্দ ছাড়া আগাচ্ছি যেন অন্তত দুর থেকে আমাদের গতিবিধি কেউ (ভুত হোক বা অন্য কিছু) বুঝতে না পারে।
২ মিনিট হাটার পরেই আমরা জমিদার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম রাত তখন ১ টা ছুঁই ছুঁই, আর গ্রামের লোকদের কথা অনুযায়ী এই সময়েই তারা ওই বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখে, বাড়ির সামনে অবস্থান বুঝার জন্য আমরা আরো ৫ মিনিট পর্যবেক্ষন করলাম, তখনই কিছু একটা রান্নার ঘ্রান নাকে আসলো ঠিক মাংস বা কোন চামড়া পোড়ালে যেমন গন্ধ আসে। যদিও আমার কাছে একটু ভয় ভয় লাগছিলো তাও সবার মনোবল ঠিক রাখার জন্য এটাকে দুরের কোন ঘরের রান্না বলে এড়িয়ে গেলাম। আমরা এখন পরিত্যক্ত এবং ভয়ঙ্কর সেই জমিদার বাড়ি ঢুকার শেষ মুহুর্তে। আমরা একে অপরকে দিকনির্দেশনা দিয়ে সবাই মিলে একেবারে দক্ষিন দিকের গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। বাড়ির একটা সিমীত চৌহদ্দি বলে নেই: বাড়িটা মোটামুটি ১৫/১৬ একর হবে সামনের দিকে চিকন একটা রাস্তা যেটা মোটামুটি ব্যবহার হয়না বললেই চলে, বাড়ির উত্তরে একটি খাল আর বাকি দুইদিক ঘন গাছগাছালি জঙ্গলের মতো, মোটামুটি যাতায়াতের রাস্তা সামনের দিকের রাস্তাটাই। আর বাকি তিনদিকে জঙ্গল আর খাল।
আরমান হঠাৎ আমাকে বলে উঠলো, ভুত আসে কোন দিক দিয়ে তাহলে! সব দিক তোহ বন্ধই, সামনের দিক থেকে তো আসার কথা না, কারন ওদিকে মোটামুটি গ্রামের মানুষের আনাগোনা আছে তাই সামনের দিক দিয়ে আসলে তোহ একদিন না একদিন গ্রামের মানুষজন ভুতের দেখা পেতো, কিন্তু কেউই তো কোনদিন ভুত দেখেনাই। আরমানের কথা শুনে আমি একটু হেঁসে বললাম ভুত আসতে রাস্তা লাগে? আমি যতটুকু জানি ভুত প্রেত আর খারাপ জিন যেটাই বলি সেগুলা বাতাসের মতো চলতে পারে এবং এগুলো অদৃশ্য।
যাই হোক বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে সামনে এগোতে থাকলাম এবং কিছুটা সামনে এগিয়ে আমি অন্ধকারের মধ্যে সাদা কিছু একটা আবিস্কার করলাম এবং সবাইকে থামতে বলে মোবাইলের ডিসপ্লের লাইট দিয়ে জিনিষটা বুঝার চেষ্টা করলাম রাহাতকে মোবাইল ধরতে বলে আমি হাত লাগালাম এবং যা দেখলাম তা আমি একা এসে যেটা দেখেছিলাম সেটাই, মানুষের কঙ্কাল এবং হাড়। একা থাকা অবস্থায় আগের দিন ভয় পেলেও আজকে মনোবল হারাইনি কারন সাথে আরমান,রাহাত ও নয়ন আছে এবং আমি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি এমন কিছু ঘটবে জেনে। রাহাতকে মোবাইল ধরতে বলে আমি হাত দিয়ে কঙ্কালটা উঠালাম পরে দেখলাম আরেকটা কঙ্কাল যা ছোট বাচ্চাদের হবে, ওই কঙ্কালটা সরিয়ে আমি যা দেখলাম তাতে যে কেউ আঁতকিয়ে উঠবে, দেখলাম ভিতরে একটা গর্ত তাতে আনুমানিক ৩০/৩৫ টা কঙ্কাল হবে, মানে এটা একটা গনকবর। রাহাত আরমান আর নয়নকে কিছু একটা বলতে যেয়ে উপরের দিকে তাকালাম তাকিয়ে দেখলাম তাদের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। এতক্ষন আরমানকে মোটামুটি স্বাভাবিক মনে হলেও আরমানের মধ্যেও একটা ভয়ের ছাপ লক্ষ্য করলাম।
তাদেরকে শক্ত থাকতে বলে আমি উপরে উঠলাম, উঠে সতর্কতার সাথে আমরা চারজন ভিতরের দিকে এগোলাম, বাড়ির অবস্থা এমন মনে হচ্ছে যেন বিগত ১৫/২০ বছর এদিকে কেউ আসেনাই। সামনে হাঁটতে হাটতে একটু পরে বাড়ির ভিতরে ২ টা গলির রাস্তা পেলাম একটা সোজা পিছনের দিকের খালের দিকে গিয়েছে আরেকটা পাশের ঝোপ ঝাড়ের দিকে। দুই রাস্তার মুখে আমরা ভাগ হয়ে আমি রাহাত খালের দিকে এবং আরমান আর নয়নকে জঙ্গলের দিকে পাঠালাম, এবং মোবাইল সব সময় সচল রাখতে বললাম যেনো কারো কোন বিপদে কল দেওয়ার সাথে সাথে কল ধরতে পারে।
আমরা ২ জন করে দুই দিকে রওনা দিলাম আমি আর রাহাত বাড়ির পিছনের দিকের রাস্তা ধরে এগোচ্ছি, একটু সামনে গিয়ে পুরোনো আমলের মোটা কিছু সেগুন গাছ দেখলাম যেগুলার প্রত্যেকটির গায়ে কিছু সংখ্যা লেখা এবং ডিরেকশন চিহ্ন দেওয়া যেটা সাধারনত আমরা বিভিন্ন আঁকাবাঁকা রাস্তায় দেখি। এটা দেখে আমরা ডিরেকশ যেদিক যেদিক দেওয়া সেদিকে এগোলাম কিন্তু রাস্তা দিয়ে না গিয়ে পাশের গাছ গাছালির ভিতর দিয়া গেলাম যেন কেউ আমাদের দেখে না ফেলে সে মোতাবেক এগিয়ে প্রায় দশ মিনিট হাটার পর আমরা আবার সেই আগের জায়গায় নিজেদের আবিস্কার করলাম। আমি বুঝে গিয়েছি এমন অনেক ট্র্যাপ সামনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে তাদের ডিরেকশন মতো গিয়ে নিজের উপরেই নিজের রাগ হলো।
নয়ন আরমানদের কি অবস্থা তারা কোন কিছু পেয়েছে কিনা জানার জন্য কল দিলাম। নয়ন কল ধরে বললো তারা জমিদার বাড়ির গেষ্ট হাউজের দিকে যাচ্ছে পথে অনেক বাধার সম্মুখীন এর কথাও বললো।আমি তাদের সতর্ক থাকার কথা বলে কল রাখলাম। এবং বলেছিলাম যেন পিছনের সাইড দিয়ে ঢুকে তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে।
আমি ও রাহাত চিন্তা করলাম আর কোন ডিরেকশন বা তাদের কোন ট্র্যাপ ফলো না করে আমরা সোজা জমিদার বাড়ির পুরোনো মূল ভবনের দিকে যাবো। সেই হিসেবে আমরা এগোলাম, পথে পথে যা দেখলাম তাতে আমার মনে হইল এ বাড়িতে শত শত মানুষের লাশ গনকবর দেওয়া হয়েছে। আমার ভয় এবং মন খারাপ হলেও আমি মনোবল শক্ত রেখে সামনে এগিয়ে গেলাম। জমিদার বাড়ির ভবনের ৫০/৬০ ফুট আগে থাকতে আমার ধ্যান ধারনা সম্পুর্নরূপে পাল্টে গেছে। কারন যা দেখলাম তাতে মনে হচ্ছে বাহিরে সদরঘাট কিন্তু ভিতরে ফিটফাট, আমার মনে হচ্ছে এখানে প্রতিদিন মানুষ বা অন্য কিছুর যাতায়াত আছে, হঠাৎ ধপাস করে শব্দ পেলাম পিছনের দিকে তাকাতেই দেখলাম রাহাত নাই। আমার মাথার উপর যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, পিছনের দিকে দৌড় দিয়ে যেতেই আমাকে পিছন দিক থেকে কে জানি হেঁচকা টান দিলো, অবস্থা বুঝতে পেরে আমি——– চলবে


