বেশি লবণযুক্ত খাবার – বেশি লবন কোন খাবারে?- প্রিয় নাস্তায় লুকিয়ে থাকতে পারে অতিরিক্ত লবণ
লবণ ছাড়া খাবারের স্বাদ যেন অনেকটাই অসম্পূর্ণ। ভাত, ডাল, তরকারি থেকে শুরু করে নাস্তা—প্রায় সব খাবারেই কমবেশি লবণের ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু স্বাদ বাড়াতে গিয়ে আমরা প্রতিদিন কতটা লবণ খাচ্ছি, তার হিসাব অনেকেই রাখি না। রান্নায় দেওয়া লবণের পাশাপাশি প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ সোডিয়াম। আর এই ‘লুকানো লবণ’ দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ ও কিডনির সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ প্রতি বছর প্রায় ১৭ লাখ মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রতিদিনের খাবারে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা এখন শুধু ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসের বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
প্রতিদিন কতটা লবণ প্রয়োজন?
অনেকেই মনে করেন, রান্নায় খুব বেশি লবণ না দিলেই অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের ঝুঁকি নেই। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। কারণ আমরা যে বিস্কুট, ব্রেড, চানাচুর, চিপস, নুডলস কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত স্ন্যাকস খাই, সেগুলোতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম থাকতে পারে।
কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল পিএলসির প্রধান ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ও ডায়েটেটিকস অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান ডা. চৌধুরী তাসনিম হাসিন বলেন, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ গ্রামের মধ্যে লবণ গ্রহণ করা উচিত। তবে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ আরও কমিয়ে দৈনিক ২ থেকে ২.৫ গ্রামের মধ্যে রাখা প্রয়োজন।
তার মতে, প্রতিদিনের খাবারে অল্প অল্প করে লবণ কমানোর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্যাকেটজাত নাস্তায় লুকানো বিপদ
বর্তমান সময়ে ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে ঘরে তৈরি খাবারের পরিবর্তে প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। দ্রুত খাওয়া যায় বলে বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সস, ব্রেডসহ নানা ধরনের খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
সমস্যা হলো, এসব খাবারে থাকা লবণের পরিমাণ অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না। খাবার খুব বেশি নোনতা না লাগলেও তাতে যথেষ্ট সোডিয়াম থাকতে পারে। ফলে একসঙ্গে কয়েক ধরনের প্যাকেটজাত খাবার খেলে দিনের মোট লবণ গ্রহণ সহজেই সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ডা. হাসিনের পরামর্শ, প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় অবশ্যই পুষ্টিগুণের লেবেল পড়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে সোডিয়াম বা লবণের পরিমাণ কত, তা খেয়াল করা প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশে অনেক স্থানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পণ্যে পুষ্টিগুণের তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ না থাকায় সাধারণ ভোক্তার জন্য প্রকৃত লবণ গ্রহণের পরিমাণ বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
তরুণদের মধ্যেও বাড়ছে ঝুঁকি
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণকে অনেকে বয়স্ক মানুষের সমস্যা বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জীবনযাপনজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
এই বয়সী মানুষের একটি বড় অংশ নিয়মিত স্ট্রিট ফুড, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস খেয়ে থাকেন। ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া খাবারের পরিবর্তে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় দৈনিক সোডিয়াম গ্রহণও বেড়ে যেতে পারে।
শুধু অতিরিক্ত লবণ নয়, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের সমন্বিত প্রভাবও তরুণ বয়সে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত লবণে কিডনির ওপর চাপ
শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে গেলে অতিরিক্ত সোডিয়াম ও পানি সামলাতে কিডনিকে বেশি কাজ করতে হয়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের ফলে কিডনির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে, যা কিডনির জন্যও ক্ষতিকর।
সোডিয়াম ও পটাশিয়াম শরীরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি খনিজ। এদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকা জরুরি। অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ খাদ্যাভ্যাস ও সামগ্রিক পুষ্টির ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব হৃদ্যন্ত্র ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে।
কিডনির সমস্যার আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—এটি অনেক সময় নীরবে এগোয়। শুরুতে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। ফলে একজন মানুষ নিজের অজান্তেই দীর্ঘদিন অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করতে পারেন। পরে যখন কিডনির কার্যক্ষমতায় সমস্যা ধরা পড়ে, তখন ক্ষতি অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারে।
খাবারে স্বাদ থাকবে, কমবে লবণ
তবে লবণ কমানোর অর্থ খাবারকে বিস্বাদ করে ফেলা নয়। বরং রান্নায় স্বাদ বাড়ানোর জন্য বিকল্প উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে।
ডা. হাসিন খাবারের স্বাদ বাড়াতে লেবু, দই, সামান্য ভিনেগার কিংবা তেঁতুল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। এসব উপাদান খাবারে টক ও সতেজ স্বাদ যোগ করে। ফলে অতিরিক্ত লবণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে প্যাকেটজাত নাস্তার পরিবর্তে ঘরে তৈরি খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে। চিড়া, ঘরে তৈরি মুড়ি, মুড়কি কিংবা বিভিন্ন দেশি নাস্তা কম লবণ দিয়ে তৈরি করা সম্ভব। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—খাবারে কতটা লবণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
সচেতনতাই হতে পারে সুরক্ষা
লবণ আমাদের খাদ্যতালিকার প্রয়োজনীয় অংশ, কিন্তু অতিরিক্ত লবণ কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়। শুধু রান্নার সময় লবণ কমানোই যথেষ্ট নয়; প্যাকেটজাত খাবার, স্ন্যাকস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে কতটা সোডিয়াম যাচ্ছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
বিশেষ করে তরুণ বয়স থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। ঘরে তৈরি খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্যাকেটজাত খাবারের লেবেল পড়ার অভ্যাস করা এবং খাবারে লবণের পরিবর্তে লেবু, দই বা তেঁতুলের মতো উপাদান ব্যবহার করা হতে পারে সহজ কিছু পদক্ষেপ।
আজকের ছোট পরিবর্তনই ভবিষ্যতের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে। তাই প্রিয় নাস্তাটি খাওয়ার আগে শুধু তার স্বাদ নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা লবণের পরিমাণের কথাও একবার ভাবা দরকার।



