বৃষ্টি ও কাদায় জীবাণু থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যকর পরামর্শ জেনে নিন
বর্ষাকাল মানেই শীতল বাতাস সাথে ঝিরঝির বৃষ্টি আর গ্রামীণ জীবনে বর্ষা ঋতু একদিকে যেমন প্রকৃতির নতুনরূপ নিয়ে আসে, ঠিক তেমনি নানান রোগ আর সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বৃষ্টি ও কাদাপানিতে ছড়িয়ে পড়ে থাকে নানা জীবাণু, যা থেকে দেখা দিতে পারে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, চর্মরোগ, ডেঙ্গু ও জ্বরসহ অন্যান্য অসুখ। তাই বর্ষার এই সময়টাতে বিশেষভাবে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। বর্ষাকালে পোশাক থেকে যাতে জীবাণু না ছড়ায়, তার জন্য আপনাকে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। নিচে বৃষ্টি ও কাদার জীবাণু থেকে বাঁচতে কিছু কার্যকর পরামর্শ তুলে ধরা হলো:
১. ভেজা জুতা ও কাপড় তাড়াতাড়ি পরিবর্তন করুন
বাংলাদেশের অনেক মানুষ রাস্তাঘাটে নির্দ্বিধায় থুতু ও কফ ফেলে। রাস্তায় জমে থাকা পানি আর কাদায়ও মিশে থাকে সেই কফ-থুতুর জীবাণু। আর সেই জীবাণু রাস্তার ময়লা পানি বা কাদা থেকে বৃস্টির পানির সাথে যদি কাপড়ে লেগে যায়, তাই বৃষ্টিতে ভিজে গেলে যত দ্রুত সম্ভব শুকনো কাপড় ও জুতা পরিবর্তন করুন। ভেজা জামাকাপড় শরীরে বেশিক্ষণ থাকলে ফাঙ্গাস সংক্রমণ ও ঠাণ্ডাজনিত অসুখের ঝুঁকি বাড়ে।
২. পায়ে জল এবং কাদার সংস্পর্শ এড়ান
পায়ে কাদা বা ময়লা পানি লাগা একপ্রকার ব্যাকটেরিয়ার সরাসরি শরীরে দাওয়াত দেওয়া। বর্ষাকালে খালি পায়ে চলাফেরা এড়িয়ে চলুন। যদি সম্ভব হয় তাহলে রেইন বুট ব্যবহার করুন যা কাদা ও জীবাণু থেকে বাঁচা যায়।
৩. বাহির থেকে এসে হাত পা মুখ না ধুয়ে ঘরে প্রবেশ পরিহার করুন
বৃষ্টির দিনে বাহিরের থেকে এসে বাসায় ঢোকার সাথে সাথে হাত-পা-মুখ সাবান দিয়ে ভালোভাবে পরিস্কার করে ফেলুন। জীবাণু প্রবেশের সবচেয়ে বড় পথই হলো মুখ, চোখ ও নাক—তাই এগুলো পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. বিশুদ্ধ খাবার পানি পান করুন
বৃষ্টির দিনে পানিতে বেশি জীবাণু মিশে থাকতে পারে। তাই নিরাপদ পানি পান করতে হবে। ফিল্টার করে রাখা, ফুটানো বা বোতলজাত পানি গ্রহণ করুন। বিশেষ করে রাস্তার ধারের খাবার খাওয়ার সময় সতর্ক থাকুন—অস্বাস্থ্যকর পানির কারণে পানিবাহিত রোগ হতে পারে।
৫. ভেজা অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ থাকবেন না
বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডা লেগে গেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এতে শরীরে সহজেই ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। তাই ভিজলে দ্রুত গরম পানিতে গোসল করে নিন, এরপর শুকনো কাপড় পরুন।
৬. স্ট্রিড ফুড এড়িয়ে চলুন
বর্ষাকালে অনেকের মন চায় একটু খিচুরি বা বিরিয়ানি খেতে অনেকেই সেটা ফুটপাত থেকে গ্রহণ করেন, কিন্তু এসব খাবারে খুব সহজেই কাদাযুক্ত পানি বা ধুলাবালি মিশে যায়। এ সময় এসব খাবার খাওয়া বিপদ ডেকে আনতে পারে।
৭. নিয়মিত ঘর পরিষ্কার করুন
বৃষ্টির সময় বাসার আশপাশে পানি জমে থাকে। এতে মশা ও ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন বৃদ্ধি পায় । নিয়মিত ঘরের কোণায় জমে থাকা পানি ফেলে দিন। ফ্লোরে জীবাণুনাশক মেডিসিন দিয়ে মোছা জরুরি।
৮. প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন
বর্ষায় যদি দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, ত্বকে ফুসকুড়ি, বা পেটের সমস্যা দেখা দেয়, দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অনেক সময় সাধারণ মনে হলেও এসব সমস্যা মারাত্মক হতে পারে।
৯. কাপড় রোদ, বাতাস, তাপে রাখুন
যেসব কাপড় গরম পানিতে ধুলে নষ্ট হয় না, সেসব ধোয়ার জন্য গরম পানি ব্যবহার করতে পারেন। বৃষ্টির মৌসুমে রোদ ও বাতাসে কাপড় শুকানোর সুযোগ হয়তো কমই পাবেন। তবু বারান্দায় কাপড় মেলে দিতে চেষ্টা করুন অন্ততপক্ষে। রোদ না পেলে কাপড় বাতাসে শুকানোর পর ইস্তিরি করতে পারেন।
১০. একজনের জিনিষ অন্যজন ভাগাভাগি করবেন না
এই বর্ষার মৌসুমে তোয়ালে, চিরুনি বা জুতাসহ ব্যক্তিগত কোন জিনিষ কারো সঙ্গে শেয়ার করা একদম ঠিক না। এতে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস একজন থেকে আরেকজনের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
১১. নিজের নখ ও চুলের যত্ন নিন
বর্ষায় নখ ও চুলে সহজেই জীবাণু জমে থাকতে পারে। তাই নিয়মিত নখ কেটে রাখুন ও চুল পরিষ্কার রাখুন। চুল ভিজে গেলে দ্রুত শুকিয়ে ফেলুন, কারণ ভেজা চুলে সহজেই ছত্রাক জন্মাতে পারে।
১২.. বাচ্চাদের বৃষ্টিতে ভেঝা এবং খেলা থেকে বিরত রাখুন
অনেক সময় বাচ্চারা বৃষ্টিতে খেলতে চায় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দিকে এটার প্রবণতা বেশি। এটি আনন্দদায়ক হলেও ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টির পানি ও কাদা থেকে ত্বকের ইনফেকশন, জ্বর বা ফাঙ্গাল রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
১১. মশা ও পোকার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন
বর্ষায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। তাই দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার করুন এবং ঘরে মশা বা যে কোন পোকামাকড় ঢোকার পথ যেমন দরজা-জানালার ফাঁক, এগুলো বন্ধ রাখুন। মশানাশক স্প্রে ও রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন।
১৫. ফাস্ট এইড ওষুধপত্র নাগালেই রাখুন
বাড়িতে প্রয়োজনীয় ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল, অ্যান্টিসেপ্টিক লোশন, ওরস্যালাইন, মশার ক্রিম বা স্প্রে ইত্যাদি এনে রাখুন। হালকা অসুস্থতায় এগুলো কাজে দেবে। তবে পরিস্থিতি গুরুতর হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
এই উপদেশগুলো অনুসরণ করলে বর্ষাকালের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। মনে রাখবেন, সচেতনতা এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাই জীবাণু ও অসুস্থতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সকল সদস্যকেও সচেতন করুন। বর্ষা উপভোগ করুন নিরাপদে ও সুস্থভাবে।



