ক্যাশলেস বাংলাদেশের পথে: ডিজিটাল পেমেন্টে সচেতনতা ও প্রণোদনার গুরুত্ব । বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর। মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রসার আমাদের জীবনযাত্রাকে বদলে দিয়েছে। কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, ভাড়া দেওয়া—সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশেও ডিজিটাল পেমেন্ট বা ই-পেমেন্ট এখন আর নতুন কিছু নয়। তবুও এখনো অনেকেই নগদ অর্থে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাই গ্রাহক পর্যায়ে ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ততা গড়ে তুলতে শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রণোদনা ও অবকাঠামোগত সহায়তা।
সম্প্রতি মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ আয়োজিত ‘বন্দরনগরীতে ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় উঠে এসেছে এসব বিষয়। চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, সুপারস্টোর ও হোটেল প্রতিনিধিরা সেখানে মতামত দেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ।
সচেতনতা ও অভ্যাস তৈরি
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এখন পুরোপুরি ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। সারাদিনে একটি কয়েনও হাতে নিতে হয় না। বাংলাদেশেও সেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। প্রতিদিন কোটি মানুষ বিকাশ, নগদ, রকেট বা ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করছেন। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।
উদ্যোক্তাদের মতে, গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোই প্রথম ধাপ। স্থানীয় ভাষায় প্রচার অভিযান চালিয়ে মানুষকে ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা বোঝানো যেতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক বা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্তদের হাতে-কলমে শেখানোর ব্যবস্থা থাকলে তারা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।
প্রণোদনা ও সুবিধা বাড়ানো দরকার
কেনাকাটায় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হলে শুধু সচেতনতা নয়, প্রয়োজন প্রণোদনামূলক উদ্যোগ। যেমন—ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্যাশব্যাক, ছাড় বা বিশেষ রিওয়ার্ড দেওয়া যেতে পারে। এতে গ্রাহকরা উৎসাহিত হবেন এবং ব্যবসায়ীরাও ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে আগ্রহী হবেন।
চট্টগ্রামের কয়েকটি সুপারস্টোর জানিয়েছে, তাদের ৭০ শতাংশ গ্রাহক বর্তমানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে মূল্য পরিশোধ করেন। যথাযথ উদ্যোগ নিলে এই হার ৯০ শতাংশের ওপরে নেওয়া সম্ভব।
প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি জরুরি
বাংলাদেশে এখনো অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ স্মার্টফোন বা স্থিতিশীল ইন্টারনেট সুবিধা পান না। তাই তাদেরও এই ইকোসিস্টেমে আনতে প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি দরকার। দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই রাখা, ইউএসএসডি কোড ব্যবহার করে অফলাইন পেমেন্টের ব্যবস্থা করা—এসব উদ্যোগ ডিজিটাল পেমেন্টকে আরও সহজ করবে।
নীতিগত সহায়তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন
বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ বলেন, “দেশে প্রতিদিন অন্তত এক কোটি মানুষ ডিজিটাল পেমেন্ট করেন। এই সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব, যদি নীতি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত পার্টনারশিপ আরও দৃঢ় করা যায়।”
তার মতে, ডিজিটাল লেনদেনের পরিসর যত বাড়বে, গ্রাহক পর্যায়ে খরচ তত কমে আসবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারে যাদের ভয় বা অনীহা আছে, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কাজও করতে হবে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্টের যাত্রা ইতিমধ্যে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। এখন সময় এই যাত্রাকে ত্বরান্বিত করার। সচেতনতা, প্রণোদনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত সহযোগিতা—এই চারটি দিকেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারলে অচিরেই বাংলাদেশও বিশ্বের ক্যাশলেস অর্থনীতির কাতারে দাঁড়াবে।
বৈশ্বিক ক্যাশলেস বিপ্লব
মার্কেট মার্চেন্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের ৫৪টি দেশ সম্পূর্ণ ক্যাশলেস ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আর ৩২টি দেশ এখনো নগদ অর্থের প্রচলন ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া—এই দেশগুলো ইতোমধ্যেই ক্যাশলেস লেনদেনে শীর্ষস্থান দখল করেছে। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—একটি নগদমুক্ত, নিরাপদ ও ট্রেসযোগ্য অর্থনীতি গড়ে তোলা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রবণতা আগামী দশকের মধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে, যেখানে প্রতিটি লেনদেন হবে ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং দ্রুত।
ইউরোপের সাফল্য: ক্যাশলেস অর্থনীতির মডেল
ক্যাশলেস ব্যবস্থার অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো সুইডেন। দেশটিতে এখন নগদ অর্থের ব্যবহার ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। ব্যাংক, দোকানপাট, এমনকি গণপরিবহনেও নগদ টাকা নেওয়া প্রায় বন্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইডেনই হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ ক্যাশলেস দেশ।
নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কও একই পথে এগোচ্ছে। এসব দেশে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ইউরোপের অভিজ্ঞতা বলছে, ক্যাশলেস অর্থনীতি শুধু সময় বাঁচায় না, এটি কর ফাঁকি, অর্থপাচার ও জাল নোটের ঝুঁকি কমায়।

